কারখানার ঝুট ব্যবসা ঘিরে গাজীপুরে তাণ্ডব, সাংবাদিককে কু/পি/য়ে জখমের অভিযোগ
- আপডেট সময় : ০৫:৫৮:৫৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬ ৩৪ বার পড়া হয়েছে

জাকারিয়া হোসেন হিমেলঃ
গাজীপুর মহানগরীর গাছা থানার ৩২ নম্বর ওয়ার্ডে একটি তৈরি পোশাক কারখানার ঝুট ব্যবসার একচ্ছত্র আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে স্থানীয় প্রভাবশালী হামিদ মণ্ডলের অস্ত্রধারী সশস্ত্র মহড়া এবং সংবাদ সংগ্রহকালে এক পেশাদার সাংবাদিককে লক্ষ্য করে মাথায় রামদা দিয়ে কোপ মেরে মারাত্মক রক্তাক্ত ও গুরুতর জখম করার নৃশংস অভিযোগ উঠেছে। ঝুট দখলকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট এই চরম উত্তেজনা ও তাণ্ডবের পেশাগত সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে মর্মান্তিকভাবে হামলার শিকার হয়েছেন জাতীয় দৈনিক ‘প্রতিদিনের কাগজ’-এর গাজীপুর মহানগর প্রতিনিধি শরীফ ওমর টুটুল। ঘটনার আকস্মিকতায় রক্তাক্ত অবস্থায় সহকর্মীরা তাঁকে দ্রুত উদ্ধার করে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন, যেখানে বর্তমানে তিনি চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী ও দায়িত্বশীল সূত্রগুলো থেকে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার গাজীপুর সিটির ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের ফকির মার্কেট সংলগ্ন ইন্ডাস্ট্রি পোশাক কারখানার সামনে এই বর্বরোচিত ঘটনাটি ঘটে। ৫ আগস্টের পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও উক্ত পোশাক কারখানার ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত কয়েকজনকে সাথে নিয়ে একটি প্রভাবশালী শক্তিশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। উক্ত সিন্ডিকেটের অন্যতম মূলহোতা হিসেবে হামিদ মণ্ডলের নাম জোরালোভাবে উঠে এসেছে। ঘটনার দিন সকাল থেকেই হামিদ মণ্ডলের ছেলে যুবলীগ নেতা সোহেলের নেতৃত্বে একদল সশস্ত্র সন্ত্রাসী দেশীয় মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে উক্ত পোশাক কারখানার আশপাশের এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করে মহড়া দিতে থাকে। মূলত কারখানার কোটি টাকার ঝুট ব্যবসার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কব্জায় রাখার উদ্দেশ্যেই সন্ত্রাসীরা এই সশস্ত্র অবস্থান নিয়েছিল বলে স্থানীয়দের দাবি।
মহড়া ও থমথমে উত্তেজনার সংবাদ পেয়ে পেশাগত দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে কয়েকজন সংবাদকর্মী দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান। একপর্যায়ে ‘প্রতিদিনের কাগজ’-এর প্রতিনিধি শরীফ ওমর টুটুল রাস্তার অপর পাশে অবস্থানরত কয়েকজন স্থানীয় লোকের কাছে সংঘাতের প্রকৃত কারণ জানতে গেলে সন্ত্রাসীরা আকস্মিক তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। হাসপাতালে শয্যাশায়ী আহত সাংবাদিক টুটুল আবেগাপ্লুত কণ্ঠে জানান, তিনি হামিদ মণ্ডলের লোকজনের কাছে গিয়ে স্থানীয় সেলিম নামের এক ব্যক্তির সাথে কথা বলছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তেই কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই পেছন থেকে তাঁর মাথা লক্ষ্য করে ধারালো রামদা দিয়ে সজোরে কোপ দেওয়া হয়। এতে ঘটনাস্থলেই তিনি রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এবং সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেন। পরবর্তীতে সঙ্গে থাকা সহকর্মী সাংবাদিকরা তাঁকে উদ্ধার করে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যান।
গুরুতর আহত সাংবাদিককে হাসপাতালে নেওয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা তাঁর মাথার ক্ষতস্থানে জরুরি অস্ত্রোপচার ও সেলাই প্রদান করেন। শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. দূরজয় জানান, ধারালো অস্ত্রের আঘাতে সাংবাদিকের মাথার ত্বক ও কয়েকটি সূক্ষ্ম স্তর কেটে গেছে। ক্ষতস্থানে সেলাই দেওয়া হলেও তাঁর প্রকৃত অভ্যন্তরীণ শারীরিক আঘাতের মাত্রা জানার জন্য সিটি স্ক্যান করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। হাসপাতালের পরিচালক আমিনুল ইসলাম জানান, আহত সাংবাদিকের চিকিৎসায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং চিকিৎসকরা সর্বাত্মক সেবা প্রদান করছেন। ঘটনা শুনে প্রতিদিনের কাগজ-এর বিশেষ প্রতিনিধি মো. আখতার হোসেন হাসপাতালে গিয়ে সহকর্মীর খোঁজখবর নেন এবং চিকিৎসকদের সাথে সার্বিক চিকিৎসার বিষয়টি তদারকি করেন।
ঘটনার পর স্থানীয় রাজনীতিক অ্যাডভোকেট কালাম জানান, সেদিন সেখানে কোনো পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটেনি, বরং তাঁরা ধাওয়া খেয়ে সরে যাওয়ার ফাঁকেই সাংবাদিক টুটুলকে নির্জন অবস্থায় কুপিয়ে জখম করা হয়। অন্যদিকে গাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম রাব্বানি জানান, পুলিশ বিষয়টি সম্পর্কে পূর্ণ অবগত এবং তদন্তের জন্য এসআই নজরুল ইসলামকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এসআই নজরুল ইসলাম জানান, তিনি দ্রুত স্থান পরিদর্শন করবেন এবং তদন্তের স্বার্থে যেকোনো ছবি বা ভিডিও ফুটেজ জমা দেওয়ার অনুরোধ করেছেন। গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার ইসরায়েল হাওলাদার স্পষ্ট জানিয়েছেন, পেশাদার সাংবাদিকের ওপর এই মারাত্মক হামলার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিচার ও তদন্ত করা হবে। তবে অভিযুক্ত হামিদ মণ্ডল ও তাঁর ছেলে সোহেলের ফোনে বারবার চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো মন্তব্য মেলেনি।
পোশাক কারখানার ঝুট সাম্রাজ্য দখলকে কেন্দ্র করে পেশাদার সাংবাদিকদের ওপর সশস্ত্র হামলা ও কুপিয়ে জখম করার ঘটনা গণমাধ্যমের স্বাধীনতাবিরোধী। এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার পেছনে থাকা মূল অপরাধী হামিদ মণ্ডল ও তাঁর বাহিনীর সকল সদস্যদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের মুখোমুখি দাঁড় করানো এখন সময়ের দাবি।









