কালীগঞ্জের সবজি বিক্রেতা যেভাবে হয়ে উঠলেন কোটিপতি— মানবপাচারের অন্ধকার সাম্রাজ্যের নেপথ্যকথা!
- আপডেট সময় : ০৮:৪১:২০ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬ ৬ বার পড়া হয়েছে

ডেস্ক রিপোর্টঃ
ফুটপাতের সবজি, পেঁয়াজ-রসুনের পসরা থেকে শুরু, আর আজ শত কোটি টাকার সাম্রাজ্যের মালিক— কালীগঞ্জের ইয়াসিন আহমেদের উত্থানকাহিনি যেন এক রূপকথা, কিন্তু তার আড়ালে লুকিয়ে আছে শত শত প্রবাসী শ্রমিকের কান্না, প্রতারণা আর রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা এক ভয়ংকর চক্রান্তের ইতিহাস।
কালীগঞ্জ মহিলা কলেজ সড়কের একটি ভবনে ঝলমলে সাইনবোর্ড।
তাতে সৌদি আরবের পতাকা আঁকা, লেখা “আমিয়াল প্রিমিয়ার ফুড অ্যান্ড অ্যাগ্রো প্রোডাক্ট”।
দেখলে মনে হবে, এ যেন কোনও আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের কার্যালয়।
কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা গিয়েছে, এই নামে কোনও প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধনই নেই কোনও সরকারি দপ্তরে।
বিদেশি লোগোর মায়াজাল বিছিয়ে একটি অস্তিত্বহীন ব্র্যান্ডকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার চেষ্টা— প্রতারণার জগতে যা এক চেনা কৌশল।
সবজিওয়ালা থেকে “ইঞ্জিনিয়ার”
কালীগঞ্জ পৌরসভার ভাদার্ত্তী এলাকার নিরক্ষর ইয়াসিন আহমেদ।
এক সময় বাজারের ফুটপাতে সাধারণ সবজি আর কাঁচামাল বিক্রি করতেন। ধীরে ধীরে সেই দোকান বদলে যায় মসলার আড়তে।
তারপর একদিন শ্রমিক ভিসায় পাড়ি জমান সৌদি আরবে। প্রবাসে গিয়েই বদলে যায় পরিচয়— নিজেকে জাহির করতে শুরু করেন “ইঞ্জিনিয়ার” বলে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, “প্রকৌশলী” শব্দটি উচ্চারণেই যাঁর সংকোচ, তিনিই ইংরেজি শব্দের আড়ালে গড়ে তোলেন এক মিথ্যা প্রতিপত্তির প্রাসাদ।
অভিযোগ, জনশক্তি রপ্তানির ব্যবসায় নেমে শত শত শ্রমিকের ঘামের টাকা আত্মসাৎ করেই ফুলেফেঁপে ওঠে তাঁর ভাণ্ডার। সেই অর্থেই বশ করেন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের, প্রতিষ্ঠিত হন সমাজের “বিত্তবান” হিসেবে।
এমনকি “আমিয়াল টিভি” নামে একটি ইউটিউব চ্যানেল খুলে নিজেকে তুলে ধরার চেষ্টা করেন সংবাদমাধ্যম-প্রতিষ্ঠাতার আসনে।
পর্যবেক্ষকদের ভাষায়, এ যেন “সমান্তরাল বৈধতা নির্মাণ”— প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি ছাড়াই এক কৃত্রিম সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার কারিগরি।
প্রতিবাদের শাস্তি: জেল আর নির্বাসন
প্রতিবাদ করলেই নেমে আসে খাঁড়া— এমনই অভিযোগ কালীগঞ্জ জুড়ে। সৌদি প্রবাসী ছাত্রদল নেতা রাহাত আল ইমরানকে ইয়াসিনের ইন্ধনে জেলে পাঠিয়ে সৌদি আরব থেকে বিতাড়িত করা হয়েছে বলে অভিযোগ।
তুমুলিয়ার আরেক তরুণকেও মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে পাঠানো হয়েছে কারাগারে।
বিদেশের মাটিতে একজন শ্রমিকের প্রতিবাদের ক্ষমতা যে কতটা ঠুনকো নিয়োগকর্তার প্রতাপের সামনে, এই ঘটনা যেন তারই এক করুণ দৃষ্টান্ত।
আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা আর অর্থের জোগানের অভিযোগও কম নয়।
৫ আগস্টের পর গা-ঢাকা দেওয়া সাবেক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকির আশীর্বাদপুষ্ট সাবেক এক ছাত্রলীগ নেতাকে সৌদি আরবে নিজের বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
কালীগঞ্জ বাজার, দড়ি সোম, মুনশুরপুর ও উত্তর ভাদার্ত্তী মৌজায় আওয়ামী লীগ নেতাদের অবৈধ অর্থে কেনা জমির মালিকানাও নাকি রাতারাতি বদলে গিয়েছে ইয়াসিনের নামে— ক্ষমতার পালাবদলে বিতর্কিত সম্পদ আড়াল করার এক সুচতুর কৌশল, বলছেন পর্যবেক্ষকরা।
লাইসেন্সহীন এক সাম্রাজ্য
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য— ইয়াসিনের “আমিয়াল ইন্টারন্যাশনাল”-এর শ্রমিক পাঠানোর কোনও বৈধ অনুমোদনই নেই। বিএমইটি-র রিক্রুটিং লাইসেন্স নেই, বায়রার সদস্যপদ নেই, নেই আটাবের অনুমোদনও। আছে শুধু বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রণালয়ের একটি ট্র্যাভেল এজেন্সি লাইসেন্স, যা দিয়ে কেবল পর্যটন সেবা দেওয়া যায়— শ্রমিক পাঠানো নয়। এই আইনি ফাঁক গলেই বছরের পর বছর প্রকাশ্যে চলছে রমরমা ব্যবসা।
স্বাভাবিক তিন মাসের সৌদি ভিসার দাম যেখানে দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা, সেখানে “আমিয়াল ইন্টারন্যাশনাল” এক বছরের ভিসা আর চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছে চার-পাঁচ লাখ টাকা— অভিযোগ এমনই।
সৌদি আরবে পৌঁছেই স্বপ্নভঙ্গ— কারাগারের মতো ক্যাম্পে দিনে দু’বেলা নামমাত্র খাবার, দীর্ঘ অনিশ্চিত অপেক্ষা, আর শেষমেশ সরকার-নির্ধারিত বেতনের অর্ধেকেরও কম। বাকি টাকা পকেটস্থ করেন ইয়াসিন নিজেই— এমনই অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
প্রতি মাসে কোটি টাকারও বেশি অর্থ এভাবে আত্মসাৎ হচ্ছে বলে দাবি স্থানীয়দের। সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে ক্যাম্প থেকে পালিয়েও যান অনেক শ্রমিক।
নিরক্ষর ব্যবসায়ীর ১০০ কোটির সাম্রাজ্য
সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য বোধহয় এটাই— বাংলাদেশে বৈধ কাগজপত্র না থাকলেও সৌদি আরবের রিয়াদে “আমিয়াল প্লাস লিমিটেড” নামে একটি বিনিয়োগ লাইসেন্স রয়েছে ইয়াসিনের, যার মূলধন দেখানো হয়েছে প্রায় তিন কোটি সৌদি রিয়াল— বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ১০০ কোটি!
প্রশ্ন উঠছে, একজন প্রায়-নিরক্ষর ব্যবসায়ী কী করে রাতারাতি এত টাকার মালিক বনে গেলেন?
অভিযোগের তির স্পষ্ট— এই বিপুল অর্থের উৎস শ্রমিকদের রক্ত-ঘামে অর্জিত বেতনের টাকা।
আজ শনিবার কালীগঞ্জের সেই প্রতিষ্ঠান প্রাঙ্গণেই বসেছে জাঁকজমকপূর্ণ এক অনুষ্ঠানের আসর, যা প্রকাশ্যে ছোট ভাইয়ের বিয়ে-পরবর্তী উৎসব বলে প্রচারিত হলেও স্থানীয়দের কটাক্ষ— রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে সখ্য জাহির করাই এর আসল উদ্দেশ্য।
নিজের অশিক্ষার ঘাটতি ঢাকতে সম্প্রতি উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের দূরশিক্ষণ কার্যক্রমে মানবিক শাখায় এসএসসি কোর্সেও ভর্তি হয়েছেন ইয়াসিন— যা তাঁর দাবি করা পরিচয় আর প্রকৃত যোগ্যতার ফারাকটাই আরও একবার স্পষ্ট করে দেয়।
দুর্বল নিয়ন্ত্রক কাঠামো, স্থানীয় রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা আর কর্মসংস্থানপ্রত্যাশী দরিদ্র মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে গড়ে ওঠা এক প্রতারণা-সাম্রাজ্য— কালীগঞ্জের এই কাহিনি যেন প্রবাসী শ্রমবাজারের গোটা ব্যবস্থারই এক নির্মম প্রতিচ্ছবি, যেখানে ক্ষতিগ্রস্ত হন সবচেয়ে অসহায় মানুষেরা, আর সুরক্ষার চাদরে ঢাকা থাকেন ক্ষমতাধরেরা।









