পদত্যাগ পত্র স্বাক্ষরের আগ মুহুর্তে যা যা ঘটেছিল-
- আপডেট সময় : ০২:০৭:৩১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ অগাস্ট ২০২৪ ৩১৪ বার পড়া হয়েছে

জাকারিয়া হোসেন হিমেলঃ
পদত্যাগ পত্র স্বাক্ষরের আগ মুহুর্তে যা যা ঘটেছিল-
সোমবার সকাল ১০ টা। গনভবনের লোকজন ভীতি ও উৎকণ্ঠার আরো একটি রাত পার করলো। শেখ হাসিনার পদত্যাগের আন্দোলন যেকোনো মূল্যে দমন করার লক্ষ্যে গনভবনের বিশাল হল রুমে তিন বাহিনী ও বিডিআর প্রধান, RAB, ডিজিএফআই, পুলিশ প্রধানের সাথে গুরুত্বপূর্ণ মিটিং ডেকেছেন শেখ হাসিনা। শেখ রেহানাও মলিন মুখে নীরবে বসে আছেন।
গণভবনে ভিন্ন রকমের একটি দিন। আগেরদিন আন্দোলনকারী ছাত্রদের সাথে সংঘর্ষে পুলিশ এবং আন্দোলন প্রতিহতকারী সশস্ত্র যুবলীগের ক্যাডাদের অনেক রক্ত ঝরলেও ছাত্ররা বীরদর্পে রাস্তা দখল করে রাখে। আজ “লং মার্চ টু ঢাকা”। বুক পেতে গু’লি নিয়ে আজ স্বৈরশাসক হাসিনাকে তারা বিদায় করতে চায়। তীব্র স্রোতের মতো ধেয়ে আসা লক্ষ লক্ষ ছাত্রজনতা গগন বিদারী আওয়াজ তুলে গণভবনের দিকে ছুটে আসছে। তারা হাসিনা সরকারকে বিদায় করে রাষ্ট্র মেরামতের শক্ত শপথ নিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী মিটিংয়ে এসেই সেনা প্রধানের দিকে আড় চোখে রাগত ভাবে তাকালেন। বিড় বিড় করে কিছু একটা বললেন। এরপর হুংকার দিয়ে বললেন, “আমি যে সেনাবাহিনীকে এতো সুযোগ-সুবিধা দিয়েছি, তারা নীরব দর্শক হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো। সামরিক বাহিনীর গাড়িতে উঠে লাল রং দিচ্ছে আন্দোলনকারীরা। কেন বাহিনী আরও কঠোর হচ্ছে না? পুলিশও খুব ভালো কিছু করতে পারে নাই। তোমাদের সামনে আমার ছাত্রলীগ, যুবলীগের ৭০ জন লোক কিভাবে মারা পড়লো? আজ তোমরা ছাত্রদের যেকোনো মূল্যে রাস্তা থেকে সরিয়ে দাও। আমি আর্মির অস্ত্র পুলিশকে দিয়েছি, এগুলো বহন করার জন্য নয়! আজ কয়েকশ রাজাকার ফেলে হলেও রাস্তা পরিষ্কার করো!”
আইজিপি বললেন, “আমার পক্ষে কয়েক শত নয়, কয়েক হাজার মারলেও ছাত্রদের ঠেকানো সম্ভব হবে না। আপনি তো ডিজিএফআই রিপোর্ট শুনলেন, দু-এক ঘন্টার মধ্যে ওরা গনভবনের গেটে পৌঁছে যাবে। আরো আগে পৌছতো, আর্মি কৌশলে তাদেরকে ঠেকিয়ে রেখেছে।”
প্রধানমন্ত্রী এবার চিৎকার করে বললেন, “আমার কী দোষ, আমি কী দোষ করেছি! আমি কি দেশের জন্য, তোমাদের জন্য কম করেছি! প্রয়োজনে আজ এক হাজার ফেলে দাও, গনভবন রক্ষা করো।” একথা শুনে সবাই নীরব হয়ে রইলেন কিছু সময়। প্রধানমন্ত্রীর এ কথাগুলোর সাথে তারা পরিচিত হলেও আজ তিনি ভিন্ন মাত্রায়, চড়া স্বরে কথা বলছেন। তার এসব আদেশ পালন করে তাকে বাঁচানো যাবে না।
ডিজিএফআই এবং আইজি রেহানাকে নিয়ে পাশের রুমে গেলেন। বুঝালেন, “৫/১০ হাজার মেরেও এ আন্দোলন আর দমন করা যাবে না। আপনি ওনাকে বুঝান।”
রেহানা ধীর লয়ে মিটিংয়ে পুনরায় এসে বসে বড় বোনের কাঁধে হাত রাখলেন, এ প্রথম তাকে সামনে রাখা সেনা সদরের তৈরী করা পদত্যাগ পত্র রেখে স্বাক্ষর করার অনুরোধ করলেন। রেহানার চোখে পানি।
প্রধানমন্ত্রী আবারও রাগতঃস্বরে প্রত্যাখ্যান করে সেনাপ্রধানকে অ থ র্ব জাতীয় একটি শব্দ বললেন। বললেন, “আমার পিতা এ দেশেকে স্বাধীনতা দিয়েছে, স্বপরিবারে জীবন দিয়েছে। আমি এ দেশের জন্য কি করি নাই? জামাত-বিএনপিকে এ দেশকে পাকিস্তান বানানোর সুযোগ দেয়া যাবে না।”
সবাই ঘড়ির দিকে তাকালেন, ডিজিএফআই বারবার রিপোর্ট নিলেন- ছাত্রজনতা বিশাল বিশাল উত্তাল মিছিল নিয়ে দ্রুত এগিয়ে আসছে। সময় ফুরিয়ে আসলেও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে নমনীয় হওয়ার লক্ষণ নেই। সবার মুখে অভিব্যক্তি- এ অবস্থায় কী করা যায়!
এবার পাশের রুমে গিয়ে ডিজিএফআই বিদেশে থাকা সজিব ওয়াজেদকে ফোনে বুঝালেন, “কিছুক্ষনের মধ্যে চারপাশ থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষ গনভবনে পৌঁছে যাবে। সেনাবাহিনী গুলি চালালেও তাদের হাত থেকে প্রধানমন্ত্রীকে রক্ষা করা যাবে না।”
সজিব বললেন, “ঠিক আছে আমি আম্মুকে বুঝিয়ে বলছি।”
সজিবের ফোন পেয়ে প্রধানমন্ত্রী একেবারেই স্থবির হয়ে গেলেন। মুখ কালো করে বললেন, “আমি জাতির উদ্দেশ্যে ভাষন দিবো।”
প্রায় সবাই একযোগে বলে উঠলেন, “স্যার আমরা ভাষন রেকর্ড করার সময় পাবো না। আমরা হয়তো খুব বেশী হলে জোর করে এক ঘন্টা ছাত্রজনতার রোড মার্চ ঠেকিয়ে রাখতে পারবো। ৪৫ মিনিটের মধ্যে আপনি রেডি হন, আপনার জন্য হেলিকপ্টার এবং বিমান রেডি।”
রুমের বাহির থেকে SSF এর কয়েকজন হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে আসলেন এবং হেলিকপ্টার নামার কথা জানালেন। এক প্রকার জোর করেই প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ পত্রে স্বাক্ষর নেয়া হলো। তাকে তার বেড রুমের দিকে নিয়ে যাওয়া হলো।
এসময় SSF এর ওয়ারলেস এবং তাদের বুট জুতার ঠক ঠক আওয়াজ গন ভবনে এক ভীষন রকমের তাড়াহুড়া দেখা দিলো। রেহানা ইতোমধ্যে তার বোনের বেশ কয়েকটির মতো বড় বড় লাগেজ রেডি করে ফেললেন। কড়া পাহারায় সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী গাড়ি হেলিকপ্টারের দিকে এগিয়ে গেলো। তখন ঘড়ির কাটা দুপুরের দিকে হয়ে গেছে।
তারপর যা হল …ছাত্রজনতা গনভবনের ভিতর ঢুকা শুরু করে দিয়েছে।
আমি অবাক হলাম একজন প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতার লোভে অন্ধ হয়ে গেলেন। তিনি বলেচেন- স্বজন হারানোর বেদনা আমার চেয়ে কেউ বুজবে না। আর এই তার নমুনা।
তিনি লাশের মিছিলের উপরে ক্ষমতা চান?
ভাগ্যিস সেদিন নিরাপত্তা বাহিনী তার কথা শোনেনি। তা নাহলে কত মায়ের বুক খালি হত।










